কাজী মুহাম্মদ আলমগীর স্যার জীবন-কর্মে সিদ্ধ একজন মানুষ

অধ্যক্ষ মুকতাদের আজাদ খান


মুছাপুর বদিউজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে বিদ্যালয়ের উদ্যোগে ২০০৪ সালের ৭ জানুয়ারি প্রকাশিত ম্যাগাজিনে ‘সন্দ্বীপে শিক্ষার প্রসার’ শিরোনামে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়। তখন আমি আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত।

২০০৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘সন্দ্বীপ উপজেলার শ্রেষ্ঠ ও প্রবীন প্রধান শিক্ষক কাজী মুহাম্মদ আলমগীর-এর অন্যরকম বিদায় অনুষ্ঠান’ শিরোনামে দৈনিক আজাদী-তে বিশাল ফিচার লিখেছিলাম। লেখাটি প্রকাশের পর স্যার স্কুলের অফিস সহকারী মোঃ সিরাজুদ্দৌলার মাধ্যমে আমি তাঁর নিকটাত্মীয় জানার পর, আমাকে দেখতে চান। এভাবে সম্পর্কের গোড়াপত্তন। প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালে কাজী মুহাম্মদ আলমগীর স্যারকে স্কুলের শুভাকাক্সক্ষী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা সুসংগঠিত হয়ে যেভাবে বিদায় সংবর্ধনা দিয়েছিল সম-সাময়িক সময়ে তা এক বিরল ঘটনা।
২০১১ সালে ‘শিক্ষক সমাজের বরপুত্র কাজী মুহাম্মদ আলমগীর’ শিরোনামে ‘উত্তর ফাল্গুনী’ লিটল ম্যাগাজিনে স্যারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জীবনীও লিখেছিলাম। সন্দ্বীপ অঞ্চলে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং পত্রিকা ও অনলাইনে পাঠকের আস্থায় শীর্ষে সাপ্তাহিক আলোকিত সন্দ্বীপ পত্রিকায়ও স্যারের জীবনী লিখেছিলাম।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশনার কাজে যখনি কেউ যোগাযোগ করতেন তখনি স্যার আমাকে স্মরণ করতেন। ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত স্যারের লাভ লেইনস্থ এশিয়ান আবেদীন রেসিডেন্সি’র ফ্ল্যাটে স্যারের আবেদনে আমার অন্তত ২০ বার আসা যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
আমি ‘লরিয়েট’ কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানে স্যার যেমন ভীষণ খুশি হয়েছিলেন তেমনি ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমার অংশগ্রহণে স্যার উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন।
স্যারের দুটো স্বপ্ন ছিল-
 ১) কাজী আবদুল আহাদ স্মারকগ্রন্থ রচনা
২) স্যারের নামে একটি ফাউন্ডেশন সূচনা করা।
স্মারকগ্রন্থ বিষয়ে স্যারের বাসায় তাঁর সহোদর কাজী ইকবাল আজম সহ একবার বসেছিলাম। উক্ত স্মারক গ্রন্থ এখনো আলোর মুখ দেখেনি। প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে স্যার তাঁর নামে একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আমার সাথে আলোচনা করেন।
২০১৭ সালের ১৩ জানুয়ারি ‘রোমন্থন’ শিরোনামে ‘ফোরাম ৯২’ মুছাপুর বদিউজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি গবেষণাধর্মী সংকলন প্রকাশিত হয়, যার সংকলক এবং সম্পাদক আমি। উক্ত ম্যাগাজিন দেখে রীতিমত বিষ্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন, মুছাপুর বদিউজ্জামান স্কুলের ইতিহাসে এরকম গবেষণাধর্মী প্রকাশনা এটাই প্রথম। তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে আমাকে বারবার আশীর্বাদ করছিলেন।
আলোকিত মানুষ গড়ার নিপুণ কারিগর খ্যাতিমান প্রধান শিক্ষক কাজী মুহাম্মদ আলমগীর স্যার ১৯৬৫ সালের ৩ মার্চ ঢাকার আরমানিটোলা হাম্মাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করেন এবং ১৯৬৫ সালের ২৬ জুলাই উক্ত স্কুল থেকে বিদায় নেন। এরপর এ.কে একাডেমি-গাছুয়ায় ১৯৬৬ সালের ১ জুন থেকে ১৯৭৫ সালর ৯ মার্চ পর্যন্ত ৯ বছর সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অতঃপর ১৯৭৫ সালর ১০ মার্চ থেকে ২০০৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মুছাপুর বদিউজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়ে সততা, দক্ষতা, ন্যায়নিষ্ঠ, প্রতিষ্ঠাতা পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যতœশীল হয়ে তিনি একাধারে ৩০ বছর প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষক সমাজের দীপ্তমান ব্যক্তিত্ব কাজী মুহাম্মদ আলমগীর স্যার শিক্ষকতাকে নিয়েছিলেন ব্রত, সাধনা, পেশা ও নেশা হিসেবে। তিনি ছিলেন নীতিতে অটল, প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে কঠোর, বচনে স্বল্পভাষী এবং প্রশাসনে ইস্পাত কঠিন। তিনি একাধারে ৪০ বছর শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থেকে একদিনও প্রাইভেট টিউশন করেননি।    
কাজী মুহাম্মদ আলমগীর স্যার কাজী আফাজ উদ্দিন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। তিনি উক্ত বিদ্যালয়ের আজীবন দাতা সদস্য ও দীর্ঘদিন পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন। সততা ও বিনয়ীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কাজী মুহাম্মদ আলমগীর স্যার আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ গভর্নিং বডির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য, পশ্চিম চৌকাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি সন্দ্বীপ উপজেলা শাখার সভাপতি ও সম্পাদক, সন্দ্বীপ উপজেলার শ্রেষ্ঠ মাধ্যমিক প্রধান শিক্ষক মনোনীত হয়েছিলেন দু’বার, এশিয়া আবেদিন রেসিডেন্সি ফ্ল্যাট ওনার্স এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা সন্দ্বীপ লেখক ফোরাম-এর উপদেষ্টা, সন্দ্বীপ এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের উপদেষ্টা এবং সন্দ্বীপ ইউনিক সোসাইটির উপদেষ্টা ছিলেন।
শিক্ষার আলো বিচ্চুরণে বিশেষ ভূমিকা রাখায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন কর্তৃক তিনি পুরস্কৃত ও সম্মানিত হন। যেমন- রোটারি ক্লাব অব রমনা ডিস্ট্রিক্ট ৩২৮০ বাংলাদেশ কর্তৃক ঢাকা ক্লাবে এক আনন্দঘন অনুষ্ঠানে মানবিক ও সেবামূলক কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্মাননা, সনদ ও ক্রেস্ট  সংবর্ধনা প্রদান (২০০০ সালের ৩১ অক্টোবর), সন্দ্বীপ উপজেলার শ্রেষ্ঠ মাধ্যমিক শিক্ষক হিসেবে রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ কর্তৃক গুণীজন সম্মানননা প্রদান (২০০৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর), জাতীয় শিক্ষক দিবস উপলক্ষে সন্দ্বীপ উপজেলার শ্রেষ্ঠ ও প্রবীণ প্রধান শিক্ষক হিসেবে সন্দ্বীপ উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক সম্মাননা প্রদান (২০০৪ সালের ১৯ জানুয়ারি), মাস্টার হারুন অর রশিদ এডুকেশন প্রাইজ কর্তৃক শ্রেষ্ঠ মাধ্যমিক প্রধান শিক্ষক হিসেবে সংবর্ধনা প্রদান (২০০৪ সালের ১৮ এপ্রিল), মুছাপুর বদিউজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিদ্যালয়ের শুভাকাক্সক্ষী ও প্রাক্তন ছাত্রদের উদ্যোগে শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা ও অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিদায় সংবর্ধনা প্রদান (২০০৫ সালের ৮ নভেম্বর। স্মরণকালের উক্ত বিরল বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্যার ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য হরেক রকমের উপহার ও ব্যবহার সামগ্রী প্রদান ছাড়াও নগদ এক লক্ষ ছয় হাজার টাকা প্রদান করা হয়), বেসরকারি শিক্ষকের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখা কর্তৃক সম্মাননা প্রদান (২০০৮ সালের ২২ আগস্ট), রুপালী ক্রেডিট কো-অপারেটিভ লিমিটেড কর্তৃক সংবর্ধনা প্রদান (২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি) এবং ফিমেল সেকেন্ডারি স্কুল এন্ড এ্যাসিসটেন্স প্রজেক্ট কর্তৃক নারী শিক্ষা প্রসারে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সন্দ্বীপ উপজেলায় শ্রেষ্ঠ মাধ্যমিক প্রধান শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা প্রদান।
কাজী মুহাম্মদ আলমগীর স্যার ১৯৫৯ সালে সাউথ সন্দ্বীপ হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬২ সালে চট্টগ্রামস্থ স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, ১৯৬৪ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএসসি এবং ১৯৬৬ সালে তিনি ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বি.এড পাশ করেন।  
কাজী মুহাম্মদ আলমগীর স্যারের পিতা- কাজী আবদুল আহাদ এক হাজার একর সম্পদের মালিক ছিলেন এবং একাধারে ৪০ বছর সারিকাইত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি তৎসময়ের জুরিবোর্ড ও ঋণ সালিশী বোর্ডের সদস্য ছিলেন। কাজী মুহাম্মদ আলমগীর স্যারের নানা বাউরিয়ার জি.কে একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা মৌলভী গোলাম খালেক। তিনি আলিয়া থেকে মাদরাসার গোল্ড মেডেলিস্ট অর্জনকারী ব্যক্তিত্ব।
কাজী মুহাম্মদ আলমগীর স্যার সন্দ্বীপ টাউনের মৌলভী বশির উল্লাহ সাব রেজিস্ট্রার চৌধুরী বাড়ির মোঃ রুহুল মঈন চৌধুরী’র ৪র্থ সন্তান ফাতেমা বেগম চৌধুরী’র সঙ্গে ১৯৬৯ সালের ১৩ মে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছয় কন্যা সন্তানের জনক।
স্যারের কন্যাবৃন্দ হলেন- যথাক্রমে কাজী তামান্না আফরোজ (পেশায় প্রাইমারি শিক্ষক), কাজী রুমান্না আক্তার (পেশায় প্রাইমারি শিক্ষক), কাজী সুমন্না আক্তার (পেশায় কলেজ শিক্ষক ছিলেন), কাজী সুলতানা ফারজানা (পেশায় প্রাইমারি শিক্ষক), কাজী তানভিলা আলমগীর লিজা (অডিট অফিসার) ও  কাজী তানজিলা কাশফী (লন্ডনে চাকুরিজীবি)।
স্যারের মেয়ের জামাইবৃন্দ হলেন- যথাক্রমে জহির উদ্দিন মোঃ বাবর (ডি.ডি, মমতা এনজিও), অধ্যাপক মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, কাজী মোঃ আবদুর রহমান মহসিন (পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব), অ্যাডভোকেট মোঃ তসলিমুল আলম, মোঃ ইকবাল হোসেন জুয়েল (ইনকাম টেক্স অফিসার) ও ব্যারিস্টার মোঃ মাহমুদুল হাসান (লন্ডন প্রবাসী)।
সিদ্ধ মানুষ কাজী মুহাম্মদ আলমগীর স্যার ২০০৬ সালে পবিত্র হজ পালন করেন।  
শিক্ষক সমাজের বটবৃক্ষ কাজী মুহাম্মদ আলমগীর স্যার ১৯৪৩ সালে ৪ জানুয়ারি সন্দ্বীপ উপজেলার বনেদী পরিবার সারিকাইত কাজী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০১৯ সালের ১৭ আগস্ট ঢাকায় বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিইউতে থাকাকালীন ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
হে আল্লাহ, স্যারকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমীন।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Comment